উৎসবহীন করোনাকাল!

5

অনলাইন ডেস্ক : শীত আসে সঙ্গে করে নিয়ে আসে উৎসবের ক্ষণ। উত্সবের উষ্ণতা কাটিয়ে দেয় শীতের ঠান্ডা। শীতকাল এলেই ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আয়োজন করে থাকেন ওয়াজ-মাহফিলের। গ্রামে-গঞ্জে বসে মেলা। দেশ জুড়ে এ সময়ই বিয়ের ধুম শুরু হয়ে যায়। অথচ, এ বছর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে যেন শীতের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। থমকে গেছে সব আয়োজন। নেই ওয়াজ-মাহফিলের কোনো আয়োজন, নেই বিয়েকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ।

রাজধানীতেও এ সময়েই শুরু হয় একের পর এক উৎসব। আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব, ঢাকা লিট ফেস্ট, পৌষ মেলা, নাট্য উৎসব কত কিছুই না আয়োজন করা হয়। কিন্তু এবার সবকিছুতেই গুড়েবালি দশা। রাজধানীর আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সেন্টারগুলো ফাঁকা, শপিং সেন্টারগুলোতেও নেই বিয়ের কেনাকাটার জৌলুস। সবাই প্রতীক্ষায় আছে কবে কাটবে এই করোনার অমানিশা।

ওয়াজ-মাহফিল আয়োজন প্রায় বন্ধ
ওয়াজ-মাহফিল হচ্ছে না বলে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ। তিনি বলেন, ধর্মীয় মাহফিল বন্ধ থাকায় মানুষ দিন-বিমুখ হয়ে অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

করোনাকালের বিধিনিষেধের কারণে মাহফিল আয়োজন এ বছর একেবারেই কমে গেছে। যেখানে রাত বাড়লেই রাস্তায় রাস্তায় প্যান্ডেল টাঙিয়ে ওয়াজের আয়োজন বসত এখন তা চোখেই পড়ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু কিছু ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন হলেও তা খুবই নগণ্য।

এদিকে, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা উদ্বোধনী বয়ানের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী বরিশালের চরমোনাই দরবার শরিফের বার্ষিক (অগ্রহায়ণ) ওয়াজ-মাহফিল শুরু হয়েছে। মাহফিলের সূচনা করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির পির সাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। আগামী সোমবার সকাল ৮টায় পির সাহেব চরমোনাই আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে তিন দিনের বার্ষিক মাহফিল শেষ হবে। মাহফিলে আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবিধি রক্ষাসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে মাহফিল মাঠগুলোতে।

বিয়ে আয়োজনে ভাটা
করোনাকাল শিথিল হওয়ার পরে বিয়ের হিড়িক পড়েছিল। এখন দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর বিয়ের মৌসুমে চলছে ভাটা। শীতে কমিউনিটি সেন্টারগুলো জমে ওঠে বর-কনেকে ঘিরে আত্মীয়স্বজনদের আনন্দ উত্সবে। পান-চিনি, গায়ে হলুদ, বিয়ে-বউভাত—কত কত আয়োজন হয়। অথচ এখন সব কমিউনিটি সেন্টার শূন্য, খাঁখাঁ। রাজধানীর কমিউনিটি সেন্টারগুলো ঘুরে দেখা যায় সেখানে বিয়ের আয়োজন নেই বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে ধানমন্ডির হোয়াইট প্যালেস কমিউনিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপক ফজলুল হক বলেন, করোনার পরে বিয়ের আয়োজন বন্ধই প্রায়। কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া অর্ধেক করে দিয়েও ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক স্টাফ ছাঁটাই করা হয়েছে। এর পরেও টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। শীতের সময় অনেকেই বুকিং দিয়েছিলেন কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সেই বুকিং ক্যানসেল করছেন। এর মধ্যেও অল্প কিছু বুকিং পাচ্ছি। কিন্তু সেসব আয়োজন খুব ছোট আকারে হচ্ছে।

তবে, কিছুটা আশার কথা জানালেন এলিফ্যান্ট রোডের বিয়ের কেনাকাটা করার দোকানগুলো। সাইকি শেরওয়ানি হাউজের স্বত্বাধিকারী কামরুল ইসলাম জানালেন, তাদের কেনাকাটা ভালো। করোনাকালে সীমিত আয়োজনের মধ্যেই বিয়ে হচ্ছে। বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। ফলে, তাদের দিন খারাপ কাটছে না। পরিমাণে কম হলেও ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে না যাওয়াতে বেশ খুশি তারা।

বসছে না মেলা
বাংলাদেশের মানুষ আর তার শৈশবের স্মৃতিতে গ্রামের মেলা জড়িয়ে নেই, এটা হতেই পারে না। গ্রামের শান্ত নিথর জীবনে গ্রামীণ মেলা যেন আনন্দের বন্যা নিয়ে হাজির হতো। দৈনন্দিন জীবনের গণ্ডির বাইরে মেলা যেন একটা দমকা হাওয়া। যেখানে হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। মানুষে মানুষে মিলবার জাতপাত, ধর্মীয় পরিচয় পেছনে ফেলে এমন মিলবার জায়গা আর কোথায়? বাংলার এই মেলা ছাড়া!

আধুনিকতার অভিঘাতে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর চরিত্র বদলাচ্ছে। আগে সব মেলাই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রামের মেলা যখন চরিত্র হারাচ্ছে কিংবা বন্ধ হতে বসেছে তখন সেই গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শহরেই শুরু হয়েছে মেলার আয়োজন। গ্রামের কোনো কোনো মেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর এ বছর করোনার অভিঘাতে বন্ধ রয়েছে সব মেলা। ফলে মেলাকে অবলম্বন করে যারা বেঁচে থাকে তাদের জীবনেও নেমে এসেছে অন্ধকার।

উৎসব নেই বর্ণহীন রাজধানী
শীতকাল যেন উত্সবের রং নিয়ে হাজির হয় রাজধানীবাসীর সামনে। নভেম্বর এলেই শুরু হয় ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। এর পরই ‘ঢাকা ফোক ফেস্ট’। তার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যায় বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল ফেস্টিভ্যালের আয়োজন। অথচ এ বছর কোনো কিছুই হচ্ছে না। করোনাকাল যেন উৎসবের সব রংই শুষে নিয়েছে। জীবনকে করে তুলেছে বর্ণহীন।

এবার উৎসব আয়োজন হচ্ছে না—এ কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল ফোক ফেস্টের আয়োজক প্রতিষ্ঠান। লিট ফেস্টের আয়োজকরাও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এ বছর বসছে না উৎসব। এদিকে, শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক মঞ্চায়ন শুরু হলেও শীতকালে যে উত্সব বসে সেসব আয়োজন অনেকটাই অনিশ্চিত। এ সময় নাট্যোত্সবের পাশাপাশি শিল্পকলায় বসে পিঠা উৎসব। এছাড়াও, পৌষ উৎসব, রস মেলাসহ নানা আয়োজনে মেতে ওঠে রাজধানীবাসী। কিন্তু সেসবের কিছুই হচ্ছে না। ফলে, উৎসবহীন একটি বছর পার করছে দেশের মানুষ। সবাই প্রতীক্ষায় আছে এই করোনাকাল কেটে গিয়ে দেশের মানুষ মেতে উঠবে আনন্দ উৎসবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here