ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ

2

অনলাইন ডেস্ক : ৩০ বছরের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রির সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ-ভিত্তিক পোশাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিউএজ গ্রুপ। এই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে চীনের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে।
সুইডিশ পোশাকজাত পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান হেনেস অ্যান্ড মরিটয এবি’র পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিউএজ। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিন দশক ধরে তারা ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য সরবরাহ করে আসছে। কিন্তু সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসি’স ইনকর্পোরেটেড ও গ্যাস ইনকর্পোরেটেড থেকে সাড়া পাচ্ছে তারা। এদিকে, নিউএজের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ভিয়েলাটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ডেভিড হাসনাত জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বার্ষিক রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক শিল্প রপ্তানিকারী দেশ বাংলাদেশ। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ায় ওই রপ্তানি আরো বেড়েছে। কেবল গত মে মাসেই রপ্তানি হয়েছে ৩৮১ কোটি ডলারের পণ্য। ট্রামপ প্রশাসন প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের চীনা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করার পরই রপ্তানিতে এই উত্থান দেখ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে উভয় দেশের মধ্যে রপ্তানিকৃত ১৯৮১টি পণ্যের অর্ধেকের বেশি পণ্যই শুল্কারোপের শিকার হয়েছে।

এতে সুযোগ বাড়ছে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের। মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের পণ্য রপ্তানিও বাণিজ্যযুদ্ধের সুযোগে বেড়েছে।
নিউএজের ইব্রাহিম বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকে পণ্য রপ্তানি বিষয়ক অনুসন্ধান বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। কেবল একজন মানুষ এককভাবে এই শুল্কারোপ করছে এখন। এতে অনেক পোশাক বিক্রেতাই কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তারা এখন তাদের ব্যবসা এদেশের দিকে নিয়ে আসছে।
গত মে মাসে ম্যাসি’স জানিয়েছে, তারা বেশ কয়েক মাস ধরেই চীন থেকে ব্যবসা সরিয়ে আনার চিন্তা করছে। একই মাসে গ্যাপও জানায় যে, তারা গত কয়েক বছর ধরেই চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে মোট রপ্তানি ৭২০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে ৪১০ কোটি ডলারের পোশাক ব্যবসায় যোগ হতে পারলে সে লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক জানিয়েছে, ওই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে পরবর্তী দুই বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ।
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতে কাজ করছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। জিডিপির ১৩ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এখন পর্যন্ত চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধে পোশাক খাত বাদ রাখা হয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে সমপর্কের অবনতি হলে সে খাতেও আরোপ হতে পারে শুল্ক। চীনে অভাব পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিকল্প হিসেবে রয়েছে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ।
ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এক চীনা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে নিউএজ। চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশের কালিয়াকৈরে ২ কোটি ডলার বিনিয়োগে একটি পোশাক কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। আগামী চার মাসের মধ্যে সেখানে উৎপাদন শুরু হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমপ্রতি তার চীন সফরে বলেছেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের আমাদের দেশে বিনিয়োগ করার বিপুল আগ্রহে সমাদর করি। তাদের জন্য আমরা একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি।
কিন্তু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পশ্চিমা সংস্থাগুলোর চুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা বাধাও রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল কমপেটিটিভনেস ইনডেক্স’এ অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম। যেখানে চীনের অবস্থান ২৩তম। চুক্তি নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে আগে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে, পোশাক কারখানাগুলো আরো আধুনিক করতে হবে, হাইওয়ে তৈরি করতে হবে ও ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে মার্চ মাসে একটি ও মে মাসে দুটি চার লেনের সেতু উদ্বোধন করেছেন। এতে বাংলাদেশের প্রধান বন্দরে পৌঁছানোর সময় কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। এসব ছাড়া বাংলাদেশে সরকার সমপ্রতি হাইওয়ে তৈরির দিকেও মনোনিবেশ করেছে। তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকা থেকে জাহাজে পণ্য ওঠাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৬৮ ঘণ্টা। অন্যদিকে, সাংহাইতে এই সময় লাগে মাত্র ২৩ ঘণ্টা।
বাংলাদেশের ব্রুমার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা খালিদ কাদির এ বিষয়ে বলেন, অবশ্যই আমাদের অবস্থা হংকং বা চীনের মতো ভালো নয়। আমাদের বন্দরে অত্যধিক ভিড় থাকে। কিন্তু সেটা হওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, সেখানে প্রচুর কনটেইনার যায়। আমাদের বন্দরগুলো এখনো প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি।
ঢাকা-ভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রপ্তানিকারীদের উৎপাদনও বৃদ্ধি করতে হবে। আর তা করার জন্য, আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নতি দরকার। পোশাক শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটানো প্রয়োজন। কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এমনটা পুরো খাতজুড়েই করতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট রুবানা হক বলেন, এরপর রয়েছে মূল্যের সুবিধা। চীন প্রতিটি পোশাক পণ্য রপ্তানি করে ২.৩০ ডলার মূল্যে। আর বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া রপ্তানি করে যথাক্রমে ২.৭৯ ডলার ও ২.৫২ ডলারে। প্রযুক্তিগত আধিপত্যের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের দিক দিয়েও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে চীন।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সেরা সমাধানটিই বের করে নিয়েছে। টলি হিলফিঙ্গারের মালিকানা প্রতিষ্ঠান পিভিএইচ কর্প, ক্যালভিন ক্লেইন সহ ভিয়েলাটেক্সের গ্রাহকদের ৩০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বিক্রেতারা। এক বছর আগে এই মার্কিন আমদানিকারকদের সংখ্যা ছিল ২০ শতাংশ। ভিয়েলাটেক্সের চেয়ারম্যান হাসনাত বলেন, আমরা আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের চাহিদা সামলাতে প্রস্তুত।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here