ধনকুবেরের বিরুদ্ধে মামলায় যেভাবে জয়ী গৃহকর্মী

5

অনলাইন ডেস্ক : সিঙ্গাপুরে এক ধনকুবেরের করা মামলায় শেষ পর্যন্ত জিতেছেন তারই গৃহকর্মী। ঘটনাটি ওই দেশে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। কারণ মামলা করেছিলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান টাইটন ও অনেক বড় বড় কোম্পানির মালিক লিউ মুন লিইয়ং।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক পারতি সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত ধনী পরিবার অর্থাৎ লিউ মুন লিইয়ংয়ের বাড়িতে মাসিক ৩৪৫ ডলার বেতনে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে করতেন।

একদিন লিউ মুন লিইয়ংয়ের পরিবার পারতির বিরুদ্ধে দামি হ্যান্ডব্যাগ, ডিভিডি প্লেয়ারসহ ঘরের জিনিসপত্র চুরির অভিযোগ আনেন। দীর্ঘ চার বছর পর এই মাসের শুরুতে, পারতি লিয়ানি ওই মামলা থেকে মুক্তি পান।

তিনি একজন দোভাষীর মাধ্যমে সাংবাদিকদের জানান, তিনি খুব খুশি যে অবশেষে তিনি মুক্ত হয়েছেন। চার বছর ধরে তিনি মামলাটি নিয়ে লড়ছিলেন।

তবে এই মামলা নিয়ে সিঙ্গাপুরের বিচার বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পারতি ২০০৭ সালে প্রথম লুই মুন লিইয়ংয়ের বাড়িতে কাজ শুরু করেছিলেন। যেখানে লিউয়েরে ছেলেসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য থাকতেন।

২০১৬ সালের সালের মার্চ মাসে, লিউ এবং তার পরিবার ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকতে শুরু করেন।

আদালতের নথিতে ঘটনায় বিবরণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় পারতিকে মালিক তার বাড়ির একাধিক অনুষ্ঠানে কাজ করতে, নতুন বাড়ি পরিষ্কার এবং অফিস পরিষ্কার করতে বলেছেন- যা স্থানীয় শ্রম বিধি ভঙ্গের শামিল ছিল। এজন্য পারতি স্থানীয়ভাবে অভিযোগও করেছিলেন।

এর কয়েক মাস পরে, লিউয়ের পরিবার পারতির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।

চাকরিচ্যুত করার পর পারতিকে জিনিসপত্র গোছানোর জন্য দুই ঘন্টা সময় দেওয়া হয়েছিল। মালিক বলেছিলেন, সব জিনিস আলাদা আলাদা বাক্সে রাখতে, যাতে পরে সেগুলো তার দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। ওই দিনই পারতি নিজে দেশে ফিরে যান।

জিনিসপত্র গোছানোর সময় লিউ বাড়ি পরিষ্কার করার নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার জন্য পারতিকে হুমকি দিয়েছিলেন।

পারতি জানান, তিনি দেশে ফেরার পর লিউয়ের পরিবার তার রেখে আসা বাক্সগুলি পরীক্ষা করেন। পরে তারা দাবি করেন, এই সব বাক্সে লিউয়ের নিজেদের ঘরের অনেক জিনিপত্র পেয়েছেন। এরপরই লিউ মুন লিইয়ং ও তার ছেলে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন।

পারতি জানান, বিষয়টি নিয়ে তার কোনও ধারণা ছিল না। কিন্তু দেশে ফেরার পাঁচ সপ্তাহ পরে যখন তিনি নতুন কর্মসংস্থানের জন্য সিঙ্গাপুরে যান তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পারতি আরও জানান, অপরাধমূলক মামলায় জড়িত থাকার কারণে তিনি আর কাজ করতে পারেননি। তাকে অভিবাসী শ্রমিকদের আশ্রয়ে থাকতে হয়েছে। পাশাপাশি মামলা চালানোর জন্য অন্যদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছে।

লিউ পরিবার পারতির বিরুদ্ধে ১১০ টি পোশাক, দামি হ্যান্ডব্যাগ, একটি ডিভিডি প্লেয়ার এবং জেরাল্ড জেন্টা ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি করার অভিযোগ আনে। এগুলোর আর্থিক মূল্য ধরা হয় ৩৪ হাজার টাকা।

বিচার চলাকালীন পারতি বারবার বোঝাতে চেয়েছেন, চুরি হওয়া বা তার বাক্সে খুঁজে পাওয়া এসব জিনিস তিনি চুরি করেননি।

২০১৯ সালে জেলা বিচারক তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকে দুই বছর ২ মাসের কারদণ্ড দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেন পারতি। পরে সিঙ্গাপুরের উচ্চ আদালত তাকে এই মাসের শুরুতে নির্দোষ হিসেবে মুক্তি দেয়।

উচ্চ আদালতের বিচারপতি চান সেন সেন ওন উপসংহারে বলেছিলেন, পারতির বিরুদ্ধে দায়ের করার অভিযোগ ওই পরিবারের উদ্দেশ্য প্রণদিত ছিল। তিনি পুলিশ, প্রসিকিউটর ও জেলা বিচারকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

এদিকে মামলাটি অনেক সিঙ্গাপুরবাসীর মন ছুয়েঁছে। বেশিরভাগ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে লিউ এবং তার পরিবারের প্রতি। অনেকেই এই মামলাকে ঘিরে বিচার ব্যবস্থায় ধনী-গরীবের বৈষম্য খুঁজে পেয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত পারতি ন্যায়বিচার পেয়েছেন তারপরও এই মামলায় অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here