রাতভর অপেক্ষা দিনভর বিক্ষোভ

2

অনলাইন ডেস্ক : শনিবার রাত দশটা। রাজধানীর কাওরান বাজারের একটি হোটেল থেকে খাবার খেয়ে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে ফুটপাথে শুয়ে পড়েন মো. গাউসুল আজম শেখ। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি সৌদি আরব থেকে ছুটিতে আসা প্রবাসী। সকাল হলেই টিকিটের টোকেন পেতে লাইনে দাঁড়াবেন বলে রাতেই এই অবস্থান। চারপাশে গাড়ির হর্নের শব্দ আর উপরে খোলা আকাশ। রাতে বৃষ্টির শঙ্কাও ছিল। তারপরও ফুটপাতে রাত কাটান গাউসুল আজম শেখের মতো কয়েক হাজার প্রবাসী। তাদের প্রত্যেকে টোকেন চাইলেও সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ মাত্র ৪৫০টি টোকেন সরবরাহ করেন রোববার।

কয়েক হাজার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী এ টোকেন নিতান্তই কম। এ কারণে রাতভর অপেক্ষা থাকা প্রবাসীদের দিন পার হয় টোকেনের দাবিতে বিক্ষোভ করে। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করায় পুলিশকে বল প্রয়োগ করতে হয়েছে তাদের ওপর। দিন শেষে অবশ্য এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এখন আগে ফরম পূরণ করে দিতে হবে প্রবাসীদের। ফরমে ভিসা ও আকামার মেয়াদ দেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টোকেন দেয়া হবে। এই ঘোষণায় ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে আসা প্রবাসীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে সোনারগাঁও হোটেলের পাশে অবস্থান করে দেখা যায়, হাজার হাজার প্রবাসী হোটেলের চারপাশে অবস্থান নেন। যেন সকাল হলেই সারিবদ্ধভাবে টোকেনের জন্য দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু শনিবার রাত অপেক্ষায় কাটিয়ে পরদিন আবার বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েন প্রবাসীরা। টিকিটের টোকেন না পাওয়ায় এক পর্যায়ে সোনারগাঁও হোটেলের ফটক ভেঙে ভেতরে অবস্থান নেন তারা। এ সময় পুলিশ ও প্রবাসীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। যদিও পুলিশের হস্তক্ষেপে প্রবাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। তবে বিক্ষোভ থেমে থাকেনি। দিনভর সড়কে যান চলাচল বন্ধ রেখে কাওরানবাজার এলাকায় মিছিল সমাবেশ করেন প্রবাসীরা।
এদিকে শনিবার রাতে সোনারগাঁও হোটেলের আশাপাশে অবস্থান নেয়াদের মধ্যে মো. গাউসুল আজম শেখ মানবজমিনকে বলেন, আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে। সৌদি আরবের মক্কায় একটি হোটেলে কাজ করি। ১২ বছর ধরে সেখানে আছি। করোনার আগে বেড়াতে আসি দেশে। এখন কফিল ভিসার মেয়াদ আরো বাড়িয়েছে। কিন্তু টিকিটের টোকেন পাচ্ছি না। আরো চার বার এসে ঘুরে গেছি। টোকেন পাইনি। তাই এই ফুটপাতে আজ রাতে থাকবো। সকালে উঠে লাইনে দাঁড়াবো। রাতে একটা হোটেল থেকে খেয়ে নিছি। টাকাও বেশি নাই। বাড়িতে আসার পর সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। একটা জমি বিক্রি করে কিছু ধারদেনা শোধ করি। আর যাওয়ার জন্য কিছু টাকা রাখছি। আমরা তো অসহায়। বিদেশের চাকরি ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নাই। এ অবস্থায় সরকার যদি কোনো সাহায্য না করে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। রাস্তায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সোহেল নামের আরেক প্রবাসী। চারদিন ধরেই সোনারগাঁও হোটেলের আশপাশে খেয়ে না খেয়ে কাটছে তার। সোহেল বলেন, বি. বাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসছি। ঢাকায় আত্মীয় নেই তেমন। থাকলেও কারো বাসায় এই করোনার সময় থাকাটা খারাপ লাগে। তাই এখানেই থাকতে হচ্ছে। সোহেল বলেন, মার্চ মাসে আমার যাওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে যেতে পারিনি। ভিসার মেয়াদও আর বেশিদিন নাই। কফিলকে জানিয়েছি। এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নাই। চাঁদপুর থেকে আসা মো. রুবেল বলেন, ভিসার মেয়াদ বেড়েছে। কিন্তু টিকিটের টোকেন পাইনি। তিনবার এসে ফিরে গেছি। গতকাল জানছি রোববার টোকেন দিবে। তাই এখনই চলে আসছি। গত দশ-বারোদিন আগে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসেন সৌদির মক্কায় কনস্ট্রাকশনের কাজ করা মো. রকিব। প্রথমে হোটেলে উঠলেও পরে আর্থিক সংকট দেখা দিলে গত ৩ দিন ধরে সড়কেই কাটছে তার। শনিবার রাতও এখানেই কাটে রকিবের। তিনি বলেন, টাকা-পয়সা যা ছিল শেষ। এখন বাড়ি যাওয়ার ভাড়া আর টিকিটের টাকা ছাড়া আমার হাত খালি। শনিবার দুপুর আর রাতে কলা-রুটি খেয়ে দিন পার করছি। টোকেন পাবো বলে ঘুরাঘুরি করে যাচ্ছি। আজ রাতেও এখানে থাকবো। আগামী সপ্তাহের মধ্যে যেতে না পারলে ভিসার মেয়াদ থাকবে না। বউ বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় নেমে যেতে হবে। বি. বাড়িয়া থেকে আসা প্রবাসী জসিম উদ্দিন জানান, আমার এক সপ্তাহ সময় আছে হাতে। না যেতে পারলে ঋণের টাকা শোধ করতে পারবো না। আর না খেয়ে মারা যাবো। বিদেশে কাজ করে টাকা কামাই করছি। এখানে তো কাজ নাই। গত কয়েকদিন ধরে ঘোরাঘুরি করে টোকেন পাইনি। আমরা কত অসহায়। হাতিরঝিলের পাড়ে অবস্থান নেয়া ফারুক হোসেন বলেন, সন্ধ্যায় নাস্তা করছি। রাতে আর কিছু খাই নাই। এখানে খাবারের দাম অনেক। এই অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে ঘুমাবো। সকালে উঠে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়াবো। এবার যদি ভাগ্য সহায় হয়। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি কোম্পানির অপারেটর হিসেবে কাজ করেন কুমিল্লার জাকির হোসেন। রোববার টিকিটের টোকেন দেয়া হবে শুনে শনিবার দুপুরেই সোনারগাঁও হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ান তিনি। রাতটাও এখানে পার করার কথা জানিয়ে জাকির বলেন, এত কষ্ট আগে কখনো করি নাই। সৌদি থেকে কতবার আসা যাওয়া করলাম। আর এখন একটা টিকিটের জন্য কতবার কুমিল্লা থেকে আপডাউন করতেছি। এই দেশে এত বাজে সিস্টেম কল্পনাও করা যায় না।
প্রবাসীদের এই দুর্ভোগকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী ফায়দা লুটছেন। রাতে অনেকেই সড়কে ঘুমানোর জন্য যে যার মতো পলিথিন, পাটির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যারা পাচ্ছেন না তাদের জন্য হকাররা পলিথিন ও পাটি সরবরাহ করছেন। এর বিনিময়ে একেক টুকরো পলিথিনের দাম ৫০-৬০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হকাররা। শাহীন নামের এক প্রবাসী অভিযোগ করে বলেন, এই সামান্য পলিথিন এক গজ ৬০ টাকা রাখছে। আমাদের দেশে সব কিছুর উপর জুলুম চলে।
এদিকে শনিবার রাতভার অপেক্ষার পর গতকাল সকাল থেকে অন্যদিনের মতো সোনারগাঁও হোটেলের ফটক ধরে লম্বা সারিতে দাঁড়ান সৌদিগামী প্রবাসীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। প্রবাসীরা ধৈর্য্য হারিয়ে এক পর্যায়ে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের প্রবেশ ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে উত্তপ্ত হয়ে যায় পরিস্থিতি। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে সাময়িক শান্ত হলেও কিছুক্ষণ পর আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রবাসীরা। এ সময় কাওরানবাজার সার্ক ফোয়ারা সামনে সড়ক অবরোধ করে মিছিল করেন তারা। এর কিছুক্ষণ আগে জাহাঙ্গীর টাওয়ারের সামনের সড়কটিও বন্ধ করেন সৌদি প্রবাসীরা। অবশ্য বিকাল ৪টার দিকে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের এক ঘোষণায় অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা।
কর্তৃপক্ষ জানান, এখন থেকে ভিসার মেয়াদ অনুযায়ী টিকিট রি-ইস্যু করা হবে। সৌদি এয়ারলাইন্সের জিএম জাহিদ হোসেন জানান, প্রবাসীদের ফরম দেয়া হচ্ছে, সেই ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে জমা দিতে হবে। ফরমে ভিসার মেয়াদ, পাসপোর্ট ও মোবাইল নম্বর লিখতে হবে। ফরমে ভুল থাকলে নেয়া হবে না। ফরম দেখে পরবর্তীতে মোবাইলে মেসেজ জানিয়ে দেয়া হবে। চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সৌদি এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, ফরম যাচাই-বাছাই শেষে যাদের ভিসার মেয়াদ আগে শেষ হবে, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগেই টিকিট পাবেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here